মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

থ্যালাসেমিয়া কি? থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

রমলা চক্রবর্তী। সিজারিয়ান করে তার পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়া হয়েছে। সবই ঠিক ছিল কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তানের চেহারা হল ফ্যাকাসে।মুখাবয়ব ... thumbnail 1 summary

রমলা চক্রবর্তী। সিজারিয়ান করে তার পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়া হয়েছে। সবই ঠিক ছিল কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তানের চেহারা হল ফ্যাকাসে।মুখাবয়ব অনেকটা মোঙ্গলদের মতো। লিভার ও পীলে বেড়ে পেট বেশ মোটা। রক্ত পরীক্ষা করাতে ধরা পড়ল থ্যালাসেমিয়া। রমলা ও তার স্বামীর রক্ত পরীক্ষা করা হল। দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার কেরিয়ার। এখন সন্তানকে বাঁচাবার জন্য ২১ দিন অন্তত রক্ত দিতে হচ্ছে। এই ব্য্যবহুল চিকিৎসা এবং সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় মা ও বাবা দুজনেই দিশেহারা, মানসিকভাবে পঙ্গু।
আপনিও বিয়ে করবেন ভাবছেন? কোষ্ঠি বিচার করেছেন কিন্তু রক্ত বিচার করে দেখেছেন কি আপনি থ্যালাসেমিয়ার কেরিয়ার বাহক কিনা? যদি না করে থাকেন তবে বিয়ের আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করে দেখুন যে আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক নন। আপনি যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন আর যাকে বিয়ে করতে চলেছেন সেও যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয় তবে আপনাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া নামক মরণ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
থ্যালাসেমিয়া হল জিনবাহিত বংশগত একটি রোগ যেখানে শরীরের মধ্যে ক্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় এবং শিশু যৌবনে পা রাখার আগেই মারা যেতে পারে। থ্যালাসে কথাটির অর্থ ভূমধ্যসাগরীয় এবং মিয়ার অর্থ রক্ত সম্বন্ধীয়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অর্থাৎ সাইপ্রাস গ্রিস ইটালি ইত্যাদি অঞ্চলে এই রোগটির প্রাদুর্ভাবের জন্য এরকম নামকরণ।
রক্তের লোহিত কণিকায় (আর.বি.সি.) থাকে হিমোগ্লোবিন যার প্রধান দুটি উপাদান হল লৌহঘটিত রঞ্জক পদার্থ হেম বা আয়রণ এবং প্রোটিন জাতীয় পদার্থ গ্লোবিন। হিমোগ্লোবিনের কাজ হল অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিহিমোগ্লোবিন যৌগ উৎপন্ন করে শ্বসনের জন্য শরীরের কলাকোষে অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং শ্বসনের ফলে উৎপন্ন কার্বনডাইঅক্সাইড কার্বামিনোহিমো গ্লোবিন যৌগরূপে কলাকোষে থেকে ফুসফুসে নিয়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে শরীর থেকে নির্গত করা। সাধারণত লোহিত কণিকারত গড় আয়ু ১২০ দিন কিন্তু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের ক্ষেত্রে লোহিত কণিকাগ্যুলি ৬০-৬৫ দিনের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; ফলে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে এবং অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা) দেখা দেয়। আবার ভঙ্গুর হিমোগ্লোবিন থেকে নির্গত অতিরিক্ত লৌহ পদার্থ রোগীর যকৃৎ ও প্লীহায় জমতে থাকে এবং এই গ্রন্থি দুটি সাইজে বাড়তে থাকে এবং ক্রমশ অকেজো হয়ে পড়ে।

সাধারণত জন্মের সময় এই শিশু স্বাভাবিক থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে রক্তাপ্লতার জন্য শিশুর দেহের বৃদ্ধি কম হয়, চেহারা ফ্যাকাসে হতে থাকে, মুখমণ্ডল চ্যাপটা অনেকটা মঙ্গোলদের মতন আকার নেয়, যকৃৎ ও প্লীহা বড় হওয়ার জন্য পেট হয় মোটা এবং বয়স ৪ বৎসর হতে হতেই  শিশু সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং যৌবনে পা রাখার আগেই মারা যায়। এই শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে ২১ দিন অন্তত শরীরে রক্ত দিতে হয় যাতে তার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা যায়। আবার ঘন ঘন রক্ত সঞ্চালনের জন্য ভঙ্ঘুর হিমোগ্লোবিন থেকে অতিরিক্ত লৌহপদার্থের জন্য যকৃৎ ও প্লীহা যাতে অকেজো না হয়ে পোড়ে সেজন্য ‘আয়রন চিলেটিং থেরাপি’র মাধ্যমে অতিরিক্ত লৌহপদার্থ শরীর থেকে নির্গত করার জন্য ডেসফেরাল ও ডেফেবিপ্রোন ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। বর্তমানে জিন থেরাপির মাধ্যমেও চিকিৎসা করা হচ্ছে। এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং রোগির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় দম্পত্তি হয়ে পড়ে মানসিকভাবে পঙ্গু।
সারা পৃথিবীতে প্রায় ২০০ রকমের থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। তবে এদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া মেজর ও মাইনর এই দুটিই মরণব্যাধি বলে এখন পর্যন্ত চিহ্নিত। থ্যালাসেমিয়া মাইনর হল ‘হেটারোজাইগস’ অর্থাৎ এক্ষেত্রে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য দুটি জিনের মধ্যে একটি ক্রুটিপূর্ণ থাকে। এরা সাধারণত স্বাভাবিক জীবন যাপন করে এবং এরাই কেরিয়ার (বাহক) বলে চিহ্নিত।থ্যালাসেমিয়া মেজর হল ‘হোমোজাইগস’ অর্থাৎ এদের মা ও বাবা দুজনেই কেরিয়ার এবং দুজনেই কেরিয়ার হওয়ার ফলে এদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজর নামক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। চিকিৎসার অপ্রতুলতার জন্য শিশুর মৃত্য ঘটলে মা ও বাবা শিশুর এই পরিণতির জন্য নিজেদের দায়ী ভেবে ভেবে সারাজীবনের জন্য মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে।
এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল রক্ত-বিচার আগে কোষ্ঠি বিচার পরে। পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া যে সে থ্যালাসেমিয়া বাহক নয়।হিমোগ্লোবিন ‘ইলেক্ট্রোফোরেসিস’বা ‘হাই-পারফরমেন্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি’র মাধ্যমে জানা যায় যে কে থ্যালাসেমিয়ার বাহক আর কে বাহক নয়। এই পরীক্ষায় দেখা যায় যে কেরিয়ারদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা একটু কম থাকে কিন্তু লোহিতকণিকা বেশি থাকে; আয়রণ স্যাচুরেসন শতকরা ২০ ভাগের বেশি থাকে, সেরাসে আয়রণের মাত্রাও বেশি থাকে এবং হিমোগ্লোবিন এর পরিমাণ বেড়ে যায়। এই হিমোগ্লোবিন ৩.৬-এর বেশি থাকলে তাঁকে থ্যালাসেমিয়া মাইনর চিহ্নিত করা হয়।
আমাদের ভারতবর্ষে সিন্ধি, গুজরাটি, বাঙালি এবং পাঞ্জাবিদের মধ্যে এই রোগ বেশী দেখা যায়, প্রায় ৮-১০ শতাংশ। বিবাহেচ্ছু পুরুষ বা মহিলাদের মধ্যে যদি কেউ থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয় তবে আর একজন  থ্যালাসেমিয়ার বাহককে কখনই বিয়ে করা উচিত নয়। যদি বিয়ে হয়ে গিয়ে থাকে এবং এরপর যদি দেখা যায় যে দুজনেই কেরিয়ার তবে গর্ভধারণের আগে জেনেটিক কাউন্সেলিং করতে হবে। গর্ভধারণ হয়ে গিয়ে থাকলে গর্ভস্থ সন্তান থ্যালাসেমিয়া মেজর কিনা জানতে ‘মলিকিউলার হাইব্রিডজেসন’ পদ্ধতিতে এ্যামেনিয়টিক ফ্লুইড পরীক্ষা করতে হবে। পরীক্ষায় গর্ভস্থ সন্তান ‘থ্যালাসেমিয়া মেজর’ এ আক্রান্ত নয় সে বিষয়ে নিশ্চিত হলেই সেই সন্তান নেওয়া যাবে, অন্যথায় গর্ভপাতই কাম্য।

কোন মন্তব্য নেই

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন